যখন শিকারী ছিলাম

-মুহাম্মদুল্লাহ্ চৌধুরী

 

পূর্ব ইতিহাস:

একটা সময় ছিল বাংলাদেশে শিকার বৈধ ছিল। তখনকার কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করায় আমার লক্ষ্য। বর্তমানে দেশে শিকার বড় অপরাধ, শিকারীরা রীতিমত অপরাধী। কিন্তু ঐ সময়  প্রায় প্রত্যেকটি বনেদী পরিবারে একাধিক বন্দুক, এয়ারগান থাকতো। সেই আমলে সেনাবাহিনীর কর্নেল ছিলেন আমাদের এক চাচা। তিনিও গ্রামের বাড়ীতে আসলে নিয়মিত শিকারে যেতেন। তাছাড়া ঐ সময় এসপি, ডিসি সাহেব রাও শিকারে যতেষ্ঠ আগ্রহী ছিলেন। শিকার তখন এদেশে একটা স্পোর্টস এর মতই ছিল। ঐ সময় জাল দিয়ে পাখি ধরা কম দেখা যেত। আর বিষ দিয়ে পাখি মারা কল্পনায় করা যেত না। এত বদ বুদ্ধি তখন সবার মাথায় ছিল না।

(পরিবেশবাদী ভাইজানরা, দয়া করে মনে রাখবেন এগুলো সবই ২০১২ আগের ঘটনা। এই লেখা নিয়ে অস্থির হবার কিছু নাই।)

প্রথম ডায়ানা ৩৫ এয়ারগান দেখেছিলাম আমার ফুপাতো ভাইয়ের বন্ধুর কাছে। একদম নতুন এয়ারগানটি দেখলে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করতো। আমার ফুপাতো ভাই (পান্না ভাই) ঐ সময় খুব নামকরা শিকারী ছিলেন। বন্দুক এয়ারগানের মালিকরা উনাকে দিয়ে শিকার করতেন। কোন স্কোপ ছাড়ায় দেশী এয়ারগানের গুলি দিয়ে প্রচুর মারতে পারতেন। বন্ধু বান্ধব মিলে ৬-৭ দিনের জন্যে ক্যাম্পিং করতেন। শিকার করেই চলতো ওখানকার খাওয়া দাওয়া। উনার নিজের কোন এয়ারগান ছিলনা। অথচ এয়ারগানে তার ও তার ভাই (মুন্না ভাই)এর হাত ছিল অত্যন্ত ভাল। সেই সময় মুন্না ভাইয়ের একবার অ্যাকসিডেন্টে হাত ভেঙ্গে যাওয়ায় সবাই বলতো, শিকারের জন্যে হাত ভেঙ্গেছে। অথচ এগুলো সবই কুসংস্কার।

পান্না ভাই নিজে ভালো শিকারী হওয়ার পরেও নিজের অনেক ধনসম্পদ থাকার পরেও কখনও বন্দুক, এয়ারগান কিনেন নি। এটা আমাকে এখনও বেশ অদ্ভুত লাগে, এ নেশা কি আমৃত্য ছাড়া যায়! তবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এই নেশা খুব একটা ভালো নেশা নয়। পান্না ভাই, মুন্না ভাই, মামুন ভাই (আমার আরেক মামাত ভাই। ইনিও ভাল শিকারী ছিলেন এবং হাতের টিপও ভাল ছিল।) এদের সাথে পাখি কুড়ানোর জন্য সঙ্গী হিসাবে বেশ কয়েকবার গেছি। আমি ছোট ছেলে বলে আমার প্রতি আব্বু আম্মুর টান বেশি ছিল। দুরে কোথাও পাঠাতেন না কখনও। তারপরেও সুযোগ পেলে ওদের সাথে যেতাম।

ছোট বেলায় সারা বছর রোগে ভুগতাম বলে একদম শুকনো আর  দুর্বল ছিলাম। শিকারীর সঙ্গী হতে হলে শক্ত সমর্থ নাহলে লাভের চেয়ে ক্ষতি। তাই সঙ্গে কেউ নিতে চাইতো না। তার মধ্যেই কাছে হলে তখন যেতাম। মাঝে মধ্যে একটা দুইটা ফায়ার করতে পেতাম। এতেই খুশি।খেলার মাঠেও একই অবস্থা। কেউ দলে নিতে চায়তো না।

কয়েকবছর পর প্রায় স্বপ্ন দেখতাম এয়ারগান নিয়ে ঘুরছি। গুলি করার সময় গুলি বের হচ্ছে না। তখন কিন্তু বেশ কয়েকবছরই এয়ারগানের সাথে যোগাযোগ বন্ধ। তারপরেও মাঝে মাঝে এয়ারগানের স্বপ্ন দেখা চলতো। হঠাৎ একদিন রাজশাহীর একটি গানশপ (নাম বলছি না) থেকে হুট করে একটা এয়ারগান কিনে ফেলি। আমার তখন এয়ারগান সম্পর্কে জ্ঞান শুন্যের কোঠায়। সুতরাং দোকানদার সেই সুযোগ নিল। গুলতির চেয়েও বাজে একটা এয়ারগান ধরিয়ে দিয়ে বিদায় জানাল।

পরে নান্টু চাচার বাঁকা আর ক্ষয়ে যাওয়া ব্যারেলের ডায়ানা ৩৫ এয়ারগান চাচাত ভাই শোভনের কাছে ব্যবহার করার অনুমতি পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু কাজ হতোনা তেমন। পরে অবশ্য কোন কারন ছাড়ায় প্রশাসন নিয়ে যায়। এরপর মামুন ভাই তার ডায়ানা ৩৫ .১৭৭ এয়ারগানটি আমাকে উপহার দেন। খুশিতে কয়েকদিন ঘুম হয় নি তখন। তবে ভাল পিলেট ছাড়া যে এয়ারগান কাজের না, তখনও জানতাম না। না বুঝেই খুব সামান্য দামে ওটা বিক্রি করে হাটসান কিনেছিলাম। এখনও .১৭৭ ডায়ানা’র জন্য মন খারাপ হয়। এখানে বলে রাখি, উপহার বিক্রি করা গর্হিত অপরাধ। কিন্তু এয়ারগান এমন জিনিষ, নির্দিষ্ট লক্ষ্যে গুলি না লাগলে আপনার মাথা খারাপ হবেই।

 

বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, প্রথম শিকারটি হাতে পেতে আমার ৩ মাস লেগেছিল। সেই সময় আমার একনিষ্ঠ সঙ্গী ছিল জয়ন্ত আর মুস্তাক। ওরাও যে কিভাবে এত ধৈর্যের সাথে লেগে ছিল আল্লাহ্ জানেন। ওই সময় মোটামুটি ২৫ গজে স্ট্যাবল অ্যাকুরেসি পেলাম এসডিবি ক্লাসিক এয়ারগানে।  প্রথম শামুকখোল শিকার দেখেছিলাম মুকুল ভাইকে করতে। এত সবাই আত্মহারা হয়েছিলাম কি আর বলবো! জায়গাটা ছিল ইন্ডিয়ান বর্ডারের একদম কাছেই। মুকুল ভাই ও অত্যন্ত ভাল শিকারী ও মেকানিকাল কাজ বুঝতেন। তবে পরে আমি বেস্ট শিকারী দেখেছি শাকিলকে। এয়ারগানে  শিকারীর সমস্ত গুনাগুন বিদ্যমান তার মধ্যে। অসম্ভব এনার্জি, তীক্ষ্ম দৃষ্টিশক্তি, জীবন্ত রেঞ্জ ফাইন্ডার- সব কিছু তার মধ্যে আছে।

অভিজ্ঞতা সমূহ:

শিকারীর বন্দুক, রাইফেল বা এয়ারগান এমন হওয়া উচিত যা শিকারকে সাথে সাথে মেরে ফেলতে পারে। আহত পাখি যে কি পরিমাণ কষ্ট পেয়ে মারা যায় কখনও ভেবে দেখেছেন? আপনার হাত, পা ভেঙ্গে বনের মধ্যে ফেলে রাখলে কেমন লাগবে? সেই জন্য আপনার নিশ্চিত করতে হবে কোথায় মারলে খুব কম সময়ে আপনার শিকার মারা যাবে। যা শুধু একটি স্কোপ লাগানো শক্তিশালী গানে সম্ভব। স্কোপ না থাকলে নিখুঁত শট কখনও সম্ভব নয়। আপনার যদি সামর্থ না থাকে ভাল গান কেনার, তাহলে শিকার না করায় ভাল। পাখিকে আহত করার অধিকার আমাদের নাই।

ইন্ডিয়ান এসডিবি, চায়না বি ২ জাতীয় গানে যদি শিকার করতে চান (এদেশে নয়); তাহলে ২০ গজের মধ্যেই চেষ্টা করা উচিত। ১৫ ফুট পাউন্ড এয়ারগান হলে ৪০ গজের মধ্যে হলে মারবেন, নইলে নয়। তাহলে আহত হয়ে চলে যাওয়া কমবে। চেষ্টা করুন বড় ক্যালিবার ব্যবহার করতে। .১৭৭ এর চেয়ে .২২ শিকারের জন্য ভাল। .৩০ হলে তো কথায় নেই। কিছুদিন আগে বিখ্যাত পক্ষী বিশারদ শরীফ খানের আহত ঘুঘু সম্পর্কে পড়ে মন খুব খারাপ ছিল। লিংকটা পাচ্ছিনা যদিও। তাঁর লেখার একটা লিংক দিলাম।

সবচেয়ে শক্ত পাখি ঘুঘু। থলে বা হার্ট শর্ট, মেরুদন্ড, মাথা, পাখা ইত্যাদি না লাগলে একদিক বিধ্বস্ত হয়ে গেলেও হাতে পেতাম না।  শামুকখোল সেই তুলনায় দূর্বল বলা যায়। স্বাদের দিক থেকে জলজ শিকারগুলো একটু আঁষটে। বিশেষ কায়দায় রান্না না করলে খাওয়া যেতনা। গয়ার বা গয়াল (যেটা পানকৌড়ির বড় ভাই) রান্না না জানলে সারা বাড়ী তেলাপোকার গন্ধে ভরে যেত। পরে পদ্ধতি চেঞ্জ করার পরার দেখি দারুন খেতে। আহত পাখি ব্যাগে না রেখে ধারালো ছুরি দিয়ে সাথে সাথে জবাই করে নিতাম।

পরিবেশ প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হতো পর্যাপ্ত। বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বেশি। শিকারের জন্য ওত পেতে থাকতে গিয়ে পায়ের কাছ থেকে অনেক সাপকে সরে যেতে দেখেছি।  সতর্ক  না থাকলে নিজেই শিকার হয়ে যেতে পারতাম। শিকারে গিয়ে দুইবার ভিমরুলের হুলের স্বাদ পেয়েছি। একবার গ্রুপ বেঁধে আক্রমন করছিল গরুদের। আমার ভাতিজা তাহমিদের সঠিক সময়ের সতর্কীকরণে আল্লাহ্ রহমতে বেঁচে যায় সেবার। সাথে পানি, খাবার, দড়ি নিয়ে যাওয়া অভ্যেস ছিল।

শিকারের বিষয়ে আমরা যেটা সবসময় খেয়াল করতাম তাহলো মওশুম। যখন তখন শিকার করা আমার মধ্যে কোন কালেই ছিল না। তাছাড়া বর্ষাকালে বক জাতীয় পাখিগুলোর বাচ্চা থাকে। কোন সময় কোন পাখির বাচ্চা থাকে তা না বুঝেই শিকার করবেন না। বাচ্চা মায়ের অপেক্ষায় বসে থাকবে, খাবারের অপেক্ষায় শুকিয়ে শুকিয়ে মারা যাবে। কথাটা শিকারে যাওয়ার আগে মনে রাখবেন অবশ্যই। পর্যাপ্ত শিকার পেয়ে গেলে অকারণে সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করিনি কখনও। শিকার মূল উদ্দেশ্য হলেও নতুন নতুন জায়গা, প্রকৃতি আবিষ্কার করায় ছিল সবচেয়ে আনন্দময়। এই প্রকৃতি প্রেম মুস্তাকের মধ্যেও বেশ দেখা যেত।

পদ্মায় চখা শিকারে গেছি সামান্যই। তবে পদ্মায় যে অদ্ভুত সুন্দর প্রকৃতি দেখেছি তা অতুলনীয়। শীতকালের ভোরে আপনি যখন পদ্মার চরে যাবেন মনে হবে অন্য জগতে প্রবেশ করেছি। চারদিকে কুয়াশা, মাঝে মাঝে চর। চরগুলোতে হাজার হাজার চখা, পানকৌড়ি, বক, বালিহাঁস আর বিভিন্ন নাম না জানা পাখি দেখলেই মন ভাল হয়ে যায়।

সত্যিকার পরিবেশবাদী আর শিকারীর পার্থক্য খুবই সামান্য। তবে দিনশেষে সব শিকারীই পরিবেশ বাদী হয়েছেন সেটা বাস্তবেই দেখিছি। আমাদের স্বনামধন্য কাজী আনোয়ার হোসেন, পক্ষি বিশারদ শরীফ খান বিদেশে জিম করবেট, বুদ্ধদেব গুহ- সবাই শিকারীই ছিলেন। তাছাড়া প্রাণ বাঁচাতে প্রোটিনের জন্য শিকার সবসময় হালাল ছিল। তবে যে দেশে যে নিয়ম সেটা না মেনে ‍উপায় কি?

 

শিকার ও পরিবেশ বিষয়ক আলোচনা আরো পাবেন এখানে।

1 thought on “যখন শিকারী ছিলাম”

Leave a Comment

Don`t copy text!