সাম্প্রতিক ভাবনা
করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী  ব্লিচিং পাউডার ব্যবহারের সতর্কতা ও অন্যান্য

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী ব্লিচিং পাউডার ব্যবহারের সতর্কতা ও অন্যান্য

“করোনা থেকে বাঁচতে পাদ্রীর উপদেশে ‘ডেটল‘ খেয়ে ৫৯ জনের মৃত্যু! … প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণণ থেকে বাঁচা যাবে খ্রিস্টান পাদ্রীর এমন উপদেশে তরল জীবাণুনাশক ‘ডেটল‘ পান করে ৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। … তবে তিনি কি পরিমাণ খেয়ে বেঁচে আছেন এবং তার ভক্তরা কতখানি খাওয়ার কারণে মারা গেছেন তা জানা যায়নি।” -কালের কন্ঠ

“কাউকে সামনে পেলে একটা কথাই বলছেন ইরানের এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ‘‌দয়া করে করোনা থেকে বাঁচতে কারখানায় ব্যবহৃত অ্যালকোহল খাবেন না।’ আর তার এই কাতর আবেদনের একটাই ‌কারণ, করোনা সংক্রমণের ভয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া গুজবে কান দিয়ে ইরানের মানুষজন এখন খাচ্ছেন কারখানায় ব্যবহৃত অ্যালকোহল। 

আর বিষাক্ত মেথানল মেশানো এই অ্যালকোহল খেয়েই এখনও পর্যন্ত ইরানে মারা গেছেন কমপক্ষে ৩০০ জন। এছাড়া হাজারেরও বেশি মানুষের কেউ হয়ে গেছেন অন্ধ, কেউ বা চলে গেছেন কোমায়। গতকাল শুক্রবার (২৬ মার্চ) সামনে এসেছে এমনই মর্মান্তিক ঘটনার কথা।” –বাংলাদেশ প্রতিদিন

খবর গুলো পড়ে এই সম্পর্কে কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করলাম। ফেসবুকে বেশ কিছু গ্রুপ আছে, যেখানে মানুষের প্রশ্ন দেখে মনেহয় এখানেও ডেটল, অ্যালকোহল, ব্লিচিং পাউডার খাওয়ার মত গাধার অভাব নাই!  করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে আমরা বিভিন্ন ভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিছু কিছু প্রচেষ্টা এমনই যা করোনা আক্রমনের আগেই নিজের এবং পরিবারের বিরাট ক্ষতি করে ফেলছি। আমরা কেন যেন সব কিছু বেশি বেশি করতে যায়! জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি আমাদের দেশের মানুষ রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারে সাবধানতার ধারে কাছেও যান না। এখন যেমন ব্লিচিং পাউডার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গেছে। অনেকে বাইরে থেকে এলেই তাকে আগাপাশতলা ব্লিচিং পাউডারের পানি দিয়ে স্প্রে করা হচ্ছে। অনেকে ফলমূল শাকসব্জি পর্যন্ত ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ধুচ্ছেন। যা শরীরের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর। তাহলে দেখা যাক, ব্লিচিং পাউডারের দোষ গুন:

সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট বা ব্লিচিং পাউডার জীবাণু দুর করার জন্য খুব ভাল। তবে এটি ব্যবহার করতে হবে পানি দিয়ে খুবই সামান্য পরিমাণে এবং কখনই কোন রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে মেশানো যাবেনা। দু:খজনক হচ্ছে আমাদের দেশের একটি বিখ্যাত কোম্পানী তাদের প্যাকেটে ব্লিচের ব্যবহারের সতর্কতা সম্পর্কে কিছু্ই বলেনি।

 কি কি ব্লিচিং পাউডারের সাথে মেশানো হারাম?

  • এসিড জাতীয়  যেমন ভিনেগার, হারপিক, টাইলস ক্লিনার, গ্লাস ক্লিনার, ড্রেন ক্লিনার এবং ডিটারজেন্ট। এগুলোর সাথে ব্লিচিং পাউডার মেশালে বিষাক্ত ক্লোরিণ গ্যাস নির্গত হয়।
  • রাবিং এলকোহল, হেক্সিসল মোট কথা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সাথে মেশানো যাবে না। এক্ষেত্রে বিক্রিয়ার ফলে নির্গত হবে ক্লোরোফর্ম।
  • অ্যামোনিয়ার সাথে মেশানো যাবে না।এক্ষেত্রে বিক্রিয়া হয়ে বের হবে ক্লোরামিন গ্যাস।

 

কি কি শারিরীক ক্ষতি হয়?

 বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস  নিশ্বাসের সাথে গেলে নাক, গলা ও শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতি হবে। ফুসফুসে পানি জমবে, প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হতে পারে, কাশি, বুক ব্যথা, নিউমোনিয়া এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া চোখ জ্বালা করা, নাক দিয়ে পানি পড়া, বমি সবই সম্ভব এই ব্লিচিং পাউডারের সাথে অন্য রাসায়নিকের মিশ্রনের ফলে। ক্লোরামিন থেকে হবে নার্ভ, কিডনি, লিভার ড্যামেজ।

আমার মতে ব্লিচ ব্যবহার না করে করোনা দুর করার জন্য সাবান পানি বা ডিটারজেন্ট ব্যবহার করাই যথেষ্ঠ। আর যদি একান্তই ব্যবহার করতে হয়, তাহলে খুব সামান্য পরিমাণে কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি নাকে মাস্ক পরে কাজটি করবেন। ব্যবহারের সময় শিশুদের দুরে রাখবেন। ব্লিচিং পাউডার খোলা ড্রেন, ডাস্টবিন, গাড়ীর টায়ার এগুলোতে ব্যবহারের জন্যে ভাল। ঘরের ভেতর ব্যবহার না করাটাই মঙ্গল।

হ্যান্ড রাবগুলোর চেয়ে সাবানপানি ব্যবহার করা ভাল। হ্যান্ড রাব গুলো ব্যবহার করে আগুন থেকে দুরে থাকুন। এগুলো অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। যেহেতু করোনা ভাইরাসের বাইরের আবরণ চর্বি জাতীয়, সেহেতু বেশি ক্ষার যুক্ত সাবান বেশি কাজে দেবে। এক্ষেত্রে ডাভ জাতীয় সাবান কাজে আসবে না তেমন। ডেটল, স্যাভলন, লাইজলও ভাল জীবাণু নাশক। ঘর মোছার কাজে এগুলো পানি মিশিয়ে ব্যবহার করুন। সবগুলো আবার একসাথে মেশাবেন না। ডেটল এর যুক্তরাজ্যের ওয়েবসাইটে পড়ে দেখলাম,  ডেটল করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করতে পারে কিনা তা তারা পরীক্ষা করে দেখেনি। তবে এর আগের জীবাণু গুলো ডেটল বেশ ভালভাবেই ধ্বংস করতে সক্ষম। তার মানে দাঁড়ায় করোনা’র ক্ষেত্রেও এগুলো কাজে লাগবে।  মোবাইল ফোন, হাত ধোয়ার ট্যাপ, জুতোর তলা,  সব দরজার হাতল, হ্যান্ডওয়াশের বোতল সব কিছুই জীবাণুমুক্ত করতে পারবেন হ্যান্ড রাব বা ডেটল দিয়ে।

প্রশ্ন আসছে শাকসব্জি পরিষ্কার করবেন কিভাবে?

ফলমূল ও শাকসব্জি করোণা ভাইরাস বহন করেনা। কিন্তু যদি কোন ইনফেকটেড লোক এর উপর হাঁচি, কাশি দেয় বা কথা বলে তাহলে এর উপরও করোনার জীবাণু থাকতে পারে। আর প্রায় অবধারিত ভাবে বাজারে কেউ না কেউ হাঁচি কাশি দিচ্ছে! সেক্ষেত্রে কি করবেন? প্রথমত: যে পলিথিনে বাজার করা হয়েছে তা ফেলে দিন। অন্য ধরনের ব্যাগ হলে ডিটারজেন্ট পানিতে ডুবিয়ে রাখুন (ব্যাগ, শাকসব্জি নয়!।)

শাক জাতীয় তরকারী:

বড় গামলায় পানি নিয়ে ওগুলো ডুবিয়ে নিন। ১৫ মিনিট ভিজিয়ে ভালমত নাড়াচাড়া করুন। এরপর পানি ফেলে দিয়ে খুব জোরে পানির তোড়ে ধুয়ে ফেলুন।

গাজর, আপেল জাতীয়  শাকসব্জি ও শক্ত ফলমুল:

একটি পরিষ্কার ব্রাশ দিয়ে ঘষে ঘষে হাই প্রেশার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। এই ব্রাশটি এই কাজের জন্যেই রেখে দিন। তবে টমেটো, মাশরুম, স্ট্রবেরী জাতীয় সব্জি ও ফল হাত দিয়ে ভাল করে ঘষা দিয়েই ধুতে হবে। করোনা ভাইরাস দুর করতে ঠান্ডা পানি খুব প্রেশার দিয়ে ধুলেই যথেষ্ঠ।

ভুলেও কোন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করবেন না। এখন আপনার ইমিউনিটি দরকার। উল্টা পাল্টা রাসায়নিক ব্যবহার করে নিজেকে আরও দূর্বল করে ফেলবেন না দয়া করে। ১০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে পানি ফোটে, আর করোনা ভাইরাস ৭৩ ডিগ্রী তাপমাত্রায় মারা যায়। সুতরাং ভয়ের কিছু নাই। ভিনেগার দিয়ে ধুতে পারেন। এতে কীটনাশক বা ফরমালিন নিষ্ক্রিয় হবে। করোনা হবেনা।  শাকসব্জি ধোয়ার পর চুলোয় চাপানোর শেষে আপনার হাত সাবান দিয়ে ধুতে ভুলবেন না যেন। আর ইমিউনিটি বাড়াতে সঠিক খাবার খান, ব্যায়াম করুন, দু:শ্চিন্তা মুক্ত থাকুন।

প্রবন্ধটি যদি শেয়ার করেন অনেকের উপকার হবে। ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন। দোয়া করি, আল্লাহ্ আমাদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করবেন।

-মুহাম্মদুল্লাহ্ চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares
Don`t copy text!