সারভাইভাল ট্রেনিং হচ্ছে কঠিন পরিবেশে বেঁচে থাকা। সে হিসেবে ঢাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ  ছাড়া বাকি সবাই যারা আছি অলরেডী সারভাইভ করছি। তবে এখানে আমি বনে জঙ্গলে কিভাবে সারভাইভ করতে হয় সে ব্যাপারে আপনাদের জানানোর চেষ্টা করছি।   কি করতে হবে না জানলে এসব জায়গায় বিপদে পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। সত্যিকার অর্থে সৃষ্টিকর্তা আমাদের শরীরকে এমন ভাবে বানিয়েছেন যাতে আমরা যেকোন বন্য পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারি, অনেক কষ্ট সহ্য করতে পারি।  কিন্তু বিজ্ঞান আমাদের অলস করে দিচ্ছে।  আরামের জীবনযাপনে আমরা অভ্যস্থ।  আমাদের দেশে বনাঞ্চল কম থাকায় এই সারভাইভাল কতটা কাজে আসবে বলা মুষ্কিল।  কিন্তু জেনে রাখলে অসুবিধা কি? ডিসকাভারী চ্যানেলে বেয়ার গ্রীলকে দেখে অনেকটাই শিখে গেছেন। তারপরও অনেক কিছু জানার আছে বিপদে পড়লে কি করতে হবে।

SURVIVAL

সারভাইভালের পূর্ণরুপ কি তা জেনে রাখুন।
S = See the situation
U = Use all of your senses, undue haste makes waste
R = Remember where you’re
V = Vanquish worry and Panic
I = Improvise
V = Value living
A = Act just like the Natives
L = Live by your wits, but for now, Learn Basic Skills.

পরিস্থিতি ভালভাবে লক্ষ্য করুন, নিজস্ব সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ রাখুন, কোথায় আছেন, ভয় ও চিন্তা দুরে রাখুন, হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তা নিয়ে কাজে লেগে যান, আপনার সব বিদ্যাবুদ্ধি কাজে লাগান।  অনেকে শুধু বেঁচে থাকার সামান্য ট্রেনিং পেয়েও সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন-অনেকে তার ট্রেনিং কাজে লাগাতে না পারায় সেখানে চিরনিদ্রায় গেছেন।  বেঁচে থাকার প্রচন্ড ইচ্ছা শক্তি থাকলে অবশ্যই আপনি সফল হবেন।

পরিবেশ

খুব ভালভাবে আপনার আশপাশের পরিবেশটি লক্ষ্য করুন।  প্রত্যেক পরিবেশের নিজস্ব একটা ছন্দ আছে।  পাখির ডাক, পোকমাকড়ের শব্দ, যে কোন ধরনের গন্ধ,তাপমাত্রার পরিবর্তন ইত্যাদির দিকে লক্ষ্য রাখলে কেউ আসছে বা কোন বিপদজনক প্রানী আসছে কিনা বুঝতে পারবেন।  সেটা “বিপদ” না “সাহায্য”- সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। আপনি যদি যুদ্ধকালীন সময়ে কোন শত্রু  এলাকায় থাকেন-তাহলে এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো অবশ্যই লক্ষণীয়।  হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তা কাজে লাগাতে চেষ্টা করুন।  একটা পাথরকেও ভাল অস্ত্র বা হাতুড়িতে পরিণত করা যায়।

শারীরিক অবস্থা

আপনার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করুন।  আপনি যদি অসুস্থ বা আহত হন  সেটা সারানোর জন্য ব্যবস্থা নিন।  প্রথমত: যথেষ্ঠ পরিমানে পানি করুন যাতে পানি শূন্যতা না হয়।  যদি প্রচন্ড শীতের মধ্যে পড়েন চেষ্টা করুন কিভাবে গরম থাকা যায়।  হাইপোথারমিয়া হলে আপনি শেষ।  কিভাবে খাবার ও পানি সংগ্রহ করবেন তা ধীরে ধীরে জানবেন।

সাথে কি যন্ত্রপাতি আছেন পরীক্ষা করে দেখুন।  সেগুলো কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেটা ভেবে বের করুন।  আপনার প্রধান তিনটি জিনিষের  প্রয়োজন।  তা হচ্ছে খাবার, পানি ও আশ্রয়।  খুব তাড়াহুড়ো করবেন না।  এতে ভুল হবার সম্ভবনা বেড়ে যাবে।

নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন

ভয় এবং আতঙ্ক এই বন্য পরিবেশের প্রধান শত্রূ ।  বেশি আতঙ্কিত হলে আপনি সব কিছু গুলিয়ে ফেলবেন।  সাধারন কাজ গুলোও করতে পারবে না।  তবে এই প্রবন্ধ পড়ার পর আপনার আত্মবিশ্বাস অবশ্যই বাড়বে কারন এখন আপনি জানেন এ’ধরনের বিপদে কি করতে হবে।

 

সাথে কি রাখবেন?

এমন দূর্গম এলাকায় গেলে সাথে এমন কিছু রাখেন যা আপনার বিপদে কাজে আসবে।  এখানে সারভাইভাল কিটস পাবেন।  তবে সবসময় এগুলো কেনার সময় কোথায়? এখানে কোনটি কখন কাজে আসবে তা দেওয়া হলো:-

  • পানি- পানি জীবাণুমুক্ত করন ট্যাবলেট, তৈলাক্তহীন কনডোম-পানি পরিবহনের জন্য, প্লাস্টিকের ব্যাগ, পানির ক্যান্টিন, স্পঞ্জ ।
  • আগুন- লাইটার, ওয়াটারপ্রূফ ম্যাচ, ম্যাগনিফাইং গ্লাস, মোমবাতি।
  • আশ্রয়-তাঁবু, চাকু, কম্বল, হ্যামক, দড়ি, মশারি, করাত, বড় ছুরি।
  • খাবার- বড়শি, মাছ ধরার সুতো, প্রচুর শর্করা ও আমিষ যুক্ত চকলেট, বিস্কুট, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল।
  • ওষুধ-অ্যান্টিবায়োটিক (অ্যাজিথ্রোমাইসিন নিতে পারেন-যদি সমস্যা না থাকে।), সার্জিক্যাল ব্লেড, সার্জিক্যাল সুতো, অ্যান্টি ডায়রিয়া-ইমোডিয়াম, অ্যান্টি প্রোটোজোয়া (ফ্লাজিল, অ্যামোডিস), অ্যান্টি হিসটামিন (ফেক্সো, অ্যালাট্রল) চোখের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপস, প্যারাসিটামল, স্যালাইন, অ্যান্টি ফাংগাল, গজ এবং সাবান। আপনার সারভাইভাল বক্সের পঞ্চাশ ভাগই হবে ওষুধ পত্র।
  • সিগন্যাল-আয়না, হুইসেল (বাঁশি), পতাকা, হলুদ বা উজ্জল রঙের সিল্কের রুমাল, টচ লাইট, লেজার লাইট, সোলার প্যানেল।
  • অন্যান্য- কম্পাস, সুঁচ ও সুতো, টাকা, সানগ্লাস, ছুরি ধার করার যন্ত্র, কর্ক, লাঠি এবং অবশ্যই সারভাইভাল ম্যানুয়াল।

প্রত্যেকটা জিনিষ নিতে পারবেননা হয়তো।  চিন্তা ভাবনা করে যা প্রয়োজন তা নিন। আপনার সারভাইভাল বক্স হবে টেকসই, দরকারী এবং হাল্কা।  কিছু সাধারন জিনিষও বেশ কাজে আসে সেগুলো হচ্ছে-

  • পানি ফিল্টার করার জন্য টি-শাট।
  • মোমবাতির বদলে ছবি আঁকার ক্রেয়ন জ্বালাতে পারেন।
  • প্রচন্ড শীতে গাছের শুকনো পাতা,খড় জ্যাকেটের মধ্যে ঠেসে নিন। ঠান্ডা অনেক কমে যাবে।
  • হার্বাল গাছ যেমন মিন্ট আগুনে জ্বালালে মশা ও পোকামাকড় দুরে থাকবে।
  • পোকার কামড়ে চুলকানো কমানোর জন্য টুথপেস্ট ব্যবহার করুন।
  • কেটে গেলে অথবা খুব ঠান্ডায় মুখমন্ডল রক্ষা করতে চাইলে চ্যাপস্টিক ব্যবহার করুন।
  • রক্ত বন্ধ করতে স্যানিটারী প্যাড কাটা জায়গায় চেপে রাখুন। এটা যেহেতু জীবাণুমুক্ত-তাই সংক্রমনের কোন ভয় নেই।
  • হাতের কাছে ক্যান্টিন না থাকলে তৈলাক্তহীন কন্ডোম বেশ কাজের। এর মধ্যে পানি সংগ্রহ করে একটা মোজার মধ্যে রেখে দিন। সহজে ফাটবেনা।
  • খালি ডিমের কাগজের ঝাঁকায় সহজেই আগুন ধরানো যায়।
  • সুঁচকে চুম্বকে ঘষে সহজেই একটা কম্পাস বানানো যায়। স্থির পানিতে একটা পাতা ফেলে তার উপর সুঁচটি রাখুন। উত্তর-দক্ষিন দেখাবে।

 

পানি:

আমাদের শরীর থেকে ঘাম, প্রস্রাব ইত্যাদির কারণে পানির অভাব হতেই থাকে-বৈরী পরিবেশে যা আরও বেড়ে যেতে পারে।  যেখানে ২০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা সেখানে আপনার প্রতিদিন ৩ লিটার করে পানি পান করা প্রয়োজন।  আমাদের দেশে তো গড়ে ৩৫ ডিগ্রী তাপমাত্রা থাকে।  সে হিসাবে ৪ লিটার দরকার।  কিন্তু যদি আরও গরম পড়ে, প্রচন্ড ঠান্ডা, প্রচুর পরিশ্রম করেন বা অসুস্থ হন বা পুড়ে যান- তাহলে শরীর আরও বেশি পানিশূন্য হয়ে যায়।  সুস্থ থাকলে হলে এই পানিশূন্যতা আপনাকে পূরণ করতেই হবে।

পানি শূণ্যতার লক্ষণ গুলো দেখা যাক:

  • প্রথমত: আপনার প্রস্রাব গাঢ় হলুদ ও তীব্র গন্ধযুক্ত হবে। প্রস্রাবের পরিমাণও কমে যাবে।
  • ৫% পানি শূন্যতায় পিপাসা, অস্থিরতা, বমিভাব এবং দূর্বলতা।
  • ১০% পানি শূন্যতায় মাথা ঘোরা, মাথা ব্যথা, হাঁটতে অসুবিধা হওয়া এবং হাত পা ঝিঁ ধরা।
  • ১৫% পানির অভাবে আবছা দৃষ্টি, প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়া, জিভ ফুলে যাওয়া, কানে কম শোনা এবং ত্বক অসাড় হওয়া। ত্বক ধরে টান দিলে দেখা যাবে চামড়া চুপসে যাচ্ছে।
  • ১৫% এর বেশি পানিশূন্যতা হলে আপনি মারা যেতে পারেন।

সুতরাং সারভাইভাল পরিস্থিতিতে পানি পানের উপর জোর দিন।  শুধু পিপাসায় পানি শূন্যতার একমাত্র চিহ্ন নয়-তা তো জানলেনই।  বৈরী পরিবেশই নয়, লোকালয়ে যথেষ্ঠ পানি পান না করায় মানুষ বিভিন্ন সমস্যায় ভোগে এবং চিকিৎসকের কাছে ছোটে।  অথচ শুধুমাত্র যথেষ্ঠ পানি পান করেই অনেক ফিট থাকা যায়।  তাই সব পরিস্থিতিতেই একটু একটু পানি পান করতেই থাকুন- পিপাসা লাগুক আর নাই লাগুক।  ২৪ ঘন্টায় যদি আপনার আধা লিটার মত প্রস্রাব হয়, তাহলে বুঝতে হবে পানির লেভেল ঠিক আছে।

পানিপান সংক্রান্ত ঘটনা আরও আছে।  সর্বোচ্চ পানি পান করুন ৬ থেকে ৮ লিটার-একটু একটু করে ২৪ ঘন্টায়।  প্রচুর পানি পান (১০ লিটারের বেশি) থেকেও মৃত্যু হতে পারে-সেরিব্রাল ও পালমোনারী ঈডিমা থেকে।

যে কোন স্থানে পানি পাওয়া যেতে পারে। আপনাকে তা সংগ্রহ করে নিতে হবে। পানি কিভাবে সংগ্রহ করবেন ও পানযোগ্য করবেন তা নিয়ে এখানে আলোচনা করব।  সাথে কাপ, ক্যান্টিন, ক্যান থাকলে ভাল হয়। না থাকলে ঐ জাতীয় কিছু বানিয়ে নিতে হবে। পাথরের ফুটোয় বা খাঁজে অনেকসময় বৃষ্টির পানি জমে থাকে। সেটা পানযোগ্য। ঘণীভবন জনিত কারণে ধাতব পদার্থে অনেক সময় শিশির জমে থাকে। কাপড় ভিজিয়ে নিংড়ে সেই পানি পান করুন। মরুভূমির সব পথই পানির দিকে যায়। জীবজন্তু বা কোন বেদুইনের পথ ধরে এগুলো অবশ্যই পানির দেখা পাবেন।  পাখির ডাক যেখানে বেশি শোনা যায় সেখানেও পানির অস্তিত্ব থাকবার সম্ভবনা বেশি।

রাতের শিশিরও আপনার পানির উৎস হতে পারে। পায়ের গোড়ালীতে একটা নেকড়া বেঁধে বড় বড় ঘাসের উপর হাঁটতে থাকুন। পায়ে বাঁধা কাপড়ে শিশির জমা হবে এবং তা নিংড়ে পান করুন। এটা শুধু রাতের বেলায় সম্ভব।

পিঁপড়ে ও মৌমাছির দলও পানির দিকে রাস্তা তৈরী করে। ওদের অনুসরণ করলে পানির দেখা পাবেন। সবুজ বাঁশের মধ্যে সুস্বাদু পানি জমে থাকে (বাঁশ থেকে পানি পান করতে বেয়ার গ্রীলকে নিশ্চয় দেখেছেন)। ছোট লাঠি দিয়ে বাড়ি দিলেই বোঝা যায় ভেতর শুকনো নাকি ভরা? ছোট একটি ফুটো করে সহজেই পানি পান করতে পারেন। তাছাড়া শুকনো বাঁশের খোলেও বৃষ্টির পানি জমা হয়। সেখানেও খোঁজ করুন। তবে এটিকে ফুটিয়ে পান করা উচিত।

তুন্দ্রা অঞ্চলে তুষার ও বরফ গলিয়ে নিলেই চলবে। বরফ না গলিয়ে খেতে যাবেন না।  সরাসরি বরফ খেলে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাবে এবং ডিহাইড্রেশন হতে পারে।  তাছাড়া বরফ পুরোপুরি খাওয়ার যোগ্য নয়।  সামুদ্রিক বরফ ধুসর রঙের হয় এবং এটি অত্যন্ত লবণাক্ত।  যেসব বরফের রঙ হালকা নীলচে সেটাতে অবশ্য লবণ কম থাকে।  লবণ দুর না করে  সমূদ্রের পানি পান করবেন না।

সমূদ্রের পানি পানযোগ্য নয়। কোনভাবে এর লবণ দুর করে পান করতে হবে। এক্ষেত্রে বৃষ্টি হলে তা জমানোর চেষ্টা করুন।

অথবা সমুদ্রের লোনা জল বালিতে গভীর গর্ত করুন। পানি ভর্তি হতে দিন। এখন আগুন জ্বালিয়ে কয়েকটা পাথরকে ভাল মত গরম করে সেটা গর্তে ফেলুন। দেখবেন সাথে সাথে বাষ্প ওঠা শুরু করবে। এবার একটা কাপড়ে বাষ্পের উপর ধরে সেটা ভিজিয়ে ফেলুন এবং কাপড়টি নিংড়ে পানি পান করুন। এভাবে লবণাক্ততা দুর করতে হয়।

এছাড়া পানি ফোটানের পাত্র থাকলে সরাসরি পানি ফুটিয়ে তার বাষ্পকে উপরোক্ত নিয়মের মত ব্যবহার করুন।

মরু অঞ্চলে ক্যাকটাসে পানি জমে থাকে। সেটাকে নিংড়ে তার রস খাওয়া যায়। এছাড়া ভ্যালি এবং নীচু স্থান, টিলা, শুকনো নদী, ও হ্রদের মধ্যে যেকোন ভেজা স্থানে খনন করলে সেখানেও পানি পাওয়া যায়। ক্যাকটাসের পাল্প খাবেন না। মুখে নিয়ে চুষে ফেলে দিন।

কলাগাছ থেকে পানি সংগ্রহ

কলাগাছ থেকেও পানি পাওয়া যায়। প্রথমে গাছটি কেটে মাঝামাঝি জায়গায় একটি পাত্রের আকার দিন। দেখবেন কিছুক্ষনের মধ্যে তা ভরে উঠবে। দুই তিন বার ফেলে দেওয়ার পর সে পানি পানযোগ্য হবে। তাছাড়া নারিকেল গাছ থাকলে তো ডাবের পানি খেতে পারবেন। কিন্তু নারিকেল পানি বেশি পান করলে ল্যাক্সেটিভের কাজ করে। সেক্ষেত্রে ডায়রিয়া হয়ে যেতে পারে। গাছের বড় বড় ফোকরেও পানি জমা হয়। ময়লা ও পোকামাকড় কোন কাপড় দিয়ে ছেঁকে নিয়ে পান করা যেতে পারে।  পাম, বেওবাব, আমব্রেলা ট্রি জাতীয় উদ্ভিদও পানির উৎস।

ঝোপ থেকে পানি সংগ্রহ

পানি সংগ্রহের জন্য এটা বানাতে পারেন। এগুলোতে ২৪ ঘন্টায় .৫ লিটার থেকে ১ লিটার পানি জমা হতে পারে। এ’জন্য আপনার প্রয়োজন হবে ঢালু জায়গা, একটি প্লাস্টিক ব্যাগ, সবুজ ঝোপ (বিষাক্ত না হয়; নইলে পানিও বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে।) এবং ছোট পাথর।

  • ব্যাগটি বাতাসে পূর্ন করুন।
  • ব্যাগের এক তৃতীয়াংশ গাছ পালায় ভরে দিন। লক্ষ্য রাখুন, কোন চোখা অংশ এটি ফুটো না করে।
  • এর মধ্যে একটি ছোট পাথর রাখুন।
  • ব্যাগের মুখের ভেতর একটি স্ট্র জাতীয় কিছু রেখে মুখটি ভালমত বেঁধে নিন। স্ট্র রাখলেন যাতে মুখ না খুলেই পানি খেতে পারেন।
  • মুখটি উপর দিকে রেখে রোদের মধ্যে রেখে দিন। পাথরটি ব্যাগের ব্যালান্স রক্ষার কাজে ব্যবহার করা হয়।

পানি দূষনমুক্ত করা:

পানিতে কলেরা- টাইফয়েডের জীবাণু, কৃমি, জোঁক ইত্যাদি মিশে থাকে যা থেকে আপনি বিরাট বিপদে পড়তে পারেন। এ জন্য পানি পানযোগ্য করে তুলতে বেশ কিছু নিয়ম জানা প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পানযোগ্য হয়। কিন্তু পুকুর,নদী-নালা, খাল বিল ইত্যাদির পানিকে পান করার পূর্বে তা দূষণ মুক্ত করে নিতে হবে। বিশেষ করে যার আশে পাশে মানুষের বসতি আছে। সব ধরণের স্থলভাগের পানি ক্লোরিণ, আয়োডিন বা ফু্টিয়ে দূষণমুক্ত করে নেওয়ায় সবচেয়ে ভাল।

কি কি উপায়ে পানি দূষণমুক্ত করা যায়? নিচে আলোচনা করা হলো:

  • পানি দূষণমুক্ত ট্যাবলেট ব্যবহার করে।
  • আপনার পানির ক্যান্টিনে ২-৫ ড্রপ টিংচার আয়োডিন দিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করতে পারেন। খুব ঘোলা পানি হলে ১০ ফোঁটা দেবেন।  আধা ঘন্টা পর পান করতে পারবেন।
  • ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিলেও পানি জীবাণুমুক্ত হবে।
  • অনেকসময় এমন পানি পাওয়া যায় যা কাদা মিশ্রিত ও দূর্গন্ধ যুক্ত। এটাকে দুইভাবে পান যোগ্য করা যায়:

পানির কন্টেইনারটি কাদামিশ্রিত পানিভরে একটানা ১২ ঘন্টা রেখে দিন। এতে কাদা পাত্রের তলায় জমা হবে।

মনে রাখবেন, নিচে বর্ণিত ফিল্টার করার পর পানিকে আবার জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। এই পদ্ধতি শুধু ময়লা পরিষ্কারের জন্য। ছবিতে দেখানো হলো:

পানির ফিল্টার

ছোট নুড়ি, বালি, কয়লা ও কাপড় ব্যবহার করে সহজেই পানিকে ফিল্টার করা যায়। কাঠ কয়লা পানির দূর্গন্ধ দুর করতে সাহায্য করে।

কিছু বিপদজনক পানীয় যা পান করা উচিত নয়:

মদ বা অ্যালকোহল, কফি :     শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন আরও বেড়ে যাবে।

রক্ত                                    :     রোগ ছড়াতে পারে। তাছাড়া নোনতা স্বাদযুক্ত যা হজম করতে শরীরের আরও পানির প্রয়োজন হবে।

সমূদ্রের পানি                     : ১ লিটার সমূদ্রের পানি লবণ দুর করতে শরীরের ২ লিটার বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন। সুতরাং এই পানি লবণ দুর না করে খেলে মৃত্যু হওয়ার আশংকায় বেশি।

প্রস্রাব                                 :   শরীরের ক্ষতিকর উপাদান গুলো প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায় এবং সেই সাথে এতে ২% লবণ থাকে। না পান করায় মঙ্গল। মূত্র পানের ক্ষেত্রে বেয়ার গ্রীলের সাথে অনেকে দ্বিমত প্রকাশ করেন।

 

পানিশূন্যতা কমানোর উপায়:

খাবার খাওয়ার সময় অল্প পানি খেতে পারেন। হজমের জন্য পানির প্রয়োজন।  আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) বলেছেন, পেটের দুই ভাগ  খাবার, এক ভাগ পানি এবং একভাগ ফাঁকা রাখতে।  এটাই সর্বোকৃষ্ট পন্থা।  খাবারের সাথে পানি না খেলে পরে পানির প্রয়োজনীয়তা বাড়ে।  নিজের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

বৈরী পরিস্থিতিতে এমন সব কাজ করবেন না যাতে ঘাম বেশি হয়।

কতটা ঘাম ঝরছে তার বুঝতে খেয়াল করুন হাট বিট ও শ্বাস নেওয়ার দিকে। মিনিটে যদি ১০০-১২০ পালস রেট এবং মিনিটে ৩০ বার শ্বাস নিতে হয় তাহলে বুঝতে হবে ঘন্টায় .৭৫ থেকে ১.৫ লিটার করে পানি হারাচ্ছেন।  সুতরাং তা পূরণ করুন।

হয়তো ভাবছেন এত সময় কোথায়? বিশ্বাস করুন, বৈরী পরিবেশে সময়ের কোন অভাব হবেনা।  সবকিছু নিয়ম জানা থাকলে আপনার বেঁচে থাকার সম্ভবনা বেড়ে যাবে।  জান বাঁচানো ফরজ।

 

খাদ্য:

খাবার ছাড়া একটা মানুষ কয়েক সপ্তাহ বাঁচতে পারে।  কিন্তু সুস্থ থাকলে হলে আপনাকে খাবার খেতেই হবে।  খাবার ছাড়া  ১/২ দিনেই আপনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়বেন ।  জঙ্গলে দুইভাবে খাবার পাওয়া যেতে পারে, এক-উদ্ভিদ থেকে এবং দুই -প্রাণী থেকে।  দিনে কমপক্ষে ২০০০ ক্যালরী পূরণ হওয়া প্রয়োজন।  তারচেয়ে কমে গেলে শরীর নিজের মাংস ভেঙ্গে আপনার শরীরের শক্তি যোগান দিবে।  ফল কি হবে বুঝতেই পারছেন।  যারা মোটা থেকে স্লিম হতে চান তারা না খেয়ে স্লিম হওয়ার ভুল ফর্মূলা থেকে বের হয়ে আসুন।  এ’নিয়ে অন্য কোথাও আলোচনা করা যাবে।

 

উদ্ভিদ:

যেসব খাবারগুলো আপনাকে শক্তি দেয় তার সবগুলোই উদ্ভিদ জাতীয়। ডাল জাতীয় উদ্ভিদগুলোতে প্রোটিনও পাওয়া যায়।  যেমন-বাদাম, মটরশুঁটি, বুট ও বিভিন্ন বীজে যথেষ্ঠ প্রোটিন ও স্নেহ পদার্থ থাকে যা আপনার অভাব অনেকটা পূরণ করতে পারে।  বিভিন্ন গাছের শিকড়, ফলমূল, সবুজ শাকসবজিতেও প্রাকৃতিক চিনি থাকে যা আপনার ক্যালরী পূরণে সহায়ক হবে এবং আপনাকে শক্তি দেবে।

উদ্ভিদ জাতীয় খাদ্যকে আপনি বাতাসে, রোদে রেখে শুকিয়ে সেটা সাথে নিয়ে চলতে পারেন। তাতে সাইজ ছোট হলেও এর মধ্যের শক্তি ঠিকই কাজ করবে অর্থাৎ আপনি তা পরে খেতে পারবেন।

কোন কিছুর মাংস সংগ্রহের চেয়ে উদ্ভিদ সংগ্রহ করা সহজ। বিশেষ করে আপনি যখন শত্রূ এলাকায় থাকবেন তখন জীবিত কোন প্রাণী শিকার করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে যেকোন ফল-মূল, পাতা ই্ত্যাদি খাওয়া যায়না; অনেক উদ্ভিদই বিষাক্ত (যেমন বন্য গাজর)। লোকালয়ের কাছে যেসব উদ্ভিদজাত খাদ্য পাওয়া যায় সেগুলো খুব ভালমত পানি দিয়ে পরিষ্কার করে খেতে হবে।  কারণ প্রায় সবগুলোতে ফসলেই কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।  রাস্তার পাশে যেখান দিয়ে প্রচুর গাড়ী চলে সেসব উদ্ভিদ থেকে খাবার সংগ্রহ বিরত থাকুন।  দূষণের ফলে সেটাও দূষিত হয়ে গেছে।

 

আরও কিছু নিয়ম:-

  • পানিতে ভালমত সিদ্ধ করে নিলে সহজেই জীবাণুমুক্ত করা যায়।
  • ফাংগাস পড়া ফল কখনও খাবেন না। ফাংগাস মারাত্মক বিষাক্ত হতে পারে।
  • কাজু বাদামের মত গন্ধযুক্ত কিছু ফল আছে যা সায়ানাইড সমৃদ্ধ! খাওয়ামাত্র মারা যাবেন।
  • চেনা গাছ কিন্তু খেলেই আপনার গ্যাস ফর্ম করে-সারভাইভাল সিচুয়েশনে সেগুলো অ্যাভয়েড করুন।
  • ওক গাছের ফল এবং জলপদ্মর রাইজোম খাওয়া যায়। কিন্তু এর তেঁতো স্বাদ দুর করতে অনেকক্ষন পানিতে ফুটাতে হবে।
  • কোন কোন উদ্ভিদ অক্সালেটসমৃদ্ধ হয় (যেমন-কামরাঙা)- সেগুলো আপনার কিডনি নষ্ট করে দিতে পারে। রোদে ভালমত শুকিয়ে নিলে বা বেক করে নিলে অক্সালেট মুক্ত করা যায়।
  • মাশুরুম খেতে যাবেন না। খাওয়ার যোগ্য মাশরুম চেনা কঠিন।  তাছাড়া মাশরুমের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া শুরু হতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে।  সেজন্য বোঝা মুশকিল- মাশরুমটি বিষাক্ত নাকি খাওয়ার যোগ্য!
  • চেনা শাক সবজি ও ফল (যেমন-সবুজ আপেল) অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে ডায়রিয়া, পেটব্যথা, বমি হতে পারে।
  • পরিচিত উদ্ভিদ না হলে তার ফল মূল না খাওয়ায় ভাল।  পৃথিবীতে বিলিয়ন বিলিয়ন গাছ পালা আছে। খাওয়ার যোগ্য-অযোগ্য উদ্ভিদ বর্ণনা করে শেষ করা যাবেনা।  এ নিয়ে নতুন একটা পর্ব লেখা যাবে।  আপাতত: কিছু লক্ষণ দেওয়া হলো যেগুলো দেখে বুঝবেন এগুলো খাওয়া নিষিদ্ধ:

 

বিষাক্ত উদ্ভিদের কিছু নমুনা

  • যেসব গাছে দুধের মত রস বের হয়। (একটা গাছ আছে দুধের মত রস বের হলেও কাজে লাগে। কিন্তু চিনতে ভুল করতে পারেন-সুতরাং দুরে থাকুন।)।
  • তীক্ষ্ম এবং সাবানের মত স্বাদ।
  • কাঁটা, লোম ও শিং যুক্ত উদ্ভিদ।
  • গাজর ও মৌরীর মত দেখতে উদ্ভিদসমূহ।
  • কাজু বাদামের মত গন্ধযুক্ত পাতা-সেগুলো বিষাক্ত।
  • গোলাপী, বেগুনী শস্য খাওয়া যাবেনা।

পোকামাকড়:

বিষাক্ত পোকামাকড়সমূহ

মাংস উদ্ভিদের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর। কিন্তু প্রাণী শিকার সবসময় সহজ নয়। আপনাকে সেগুলো শেখানো হবে ধীরে ধীরে। খুব জরুরী ভিত্তিতে খাবার প্রয়োজন হলে বিভিন্ন পোকা খেতে পারেন (ওয়াক্)। শুনতে যায় মনে হোক- না খেয়ে যখন মরবেন তখন বুঝবেন কষ্ট কাকে বলে।  সব প্রানী প্রোটিনের উৎস।  অনেক পোকা কাঁচাই খাওয়া যায়।  পোকা মাকড়ে গরুর গোশতের চেয়ে ৪০-৬০% বেশি প্রোটিন থাকে।  তাই বিষাক্ত পোকা ছাড়া সবই খাওয়া যায়।  যেসব পোকা লোমশ, উজ্জ্বল রঙ বিশিষ্ট সেগুলো থেকে দুরে থাকুন।  যেসব পোকার তীব্র গন্ধ সেগুলোও বাদ।  মাকড়সা,ভীমরুল, কেন্নো, মশা, মাছি, ছারপোকা, উকুন  এগুলো খাওয়া চলবেনা।

পিঁপড়া, উই, গুবরে পোকা ভেজা কাঠ বা গাছের কাছে খোঁজ করুন। এগুলো খাওয়া যায়।  ঘেসো জমি, পাথরের নীচে এগুলোর বাসা খুঁজে পাওয়া যায়।  এগুলোর ডিমও খাওয়া যায়।  গুবরে পোকা আর ঘাস ফড়িংয়ে প্যারাসাইট থাকে।  এগুলো রান্না করে খেতে হয়।  বেশ কতকগুলো পোকা ধরে একসাথে বেশ করে চটকিয়ে নিয়ে পেস্টের মত বানিয়ে খেতে পারেন।  কোন কোন পিঁপড়ার স্বাদ মিষ্টিও হয়।

অ্যানিলিডা পর্বের (যেমন কেঁচো) পোকা গুলো ভাল প্রোটিনের উৎস। ভেজা মাটিতে একটু খোঁড়াখুঁড়ি করলেই পেয়ে যাবেন।  ধরার পর ১৫ মিনিট পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।  এখন এটাকে কাঁচায় খেতে পারবেন।

জলজ প্রাণী:

মাছ অত্যন্ত ভালো প্রোটিনের উৎস। রাতে আলো দেখে মাছ আসে।  তখন শিকার করা সহজ হয়।  যখন স্রোত জোরালো হয়, মাছেরা পাথরের আড়ালে বিশ্রাম নেয়।  আধা ডোবা গাছ, গাছের শাখা প্রশাখা বা অন্য কোন জিনিষের কাছে তারা প্রায় বসে থাকে।  এসব স্থানে মাছ ধরার চেষ্টা করুন।  স্বাদু পানির সব মাছই খাওয়া যায়।  পটকা মাছ ছাড়া।  শিং মাছ ধরতে গিয়ে সাবধান থাকুন।  হাতে কাঁটা বিঁধলে সহজেই সংক্রমন হতে পারে।  সামুদ্রিক সব মাছই খাওয়া যায়না।  কোন কোনটা বিষাক্ত হয়।  রান্না করলেও সে বিষ দুর হয়না।  বিষাক্ত মাছগুলো হচ্ছে সিগুয়েটেরা, পরকুপাইন, কাউফিস, থর্নফিস, ওয়েল ফিস, পাফার (পটকা) মাছ।ইত্যাদি।  ছবি দেখুন:

বিষাক্ত মাছ
বিষাক্ত মাছ

ক্রাস্টাসিয়ানস (যেমন চিংড়ি) ভাসমান শৈবালে খুঁজুন। কাঁকড়াও পেয়ে যেতে পারেন।  অনেকসময় পুকুরের পরিষ্কার অল্প পানিতে বসে থাকে। সহজেই ধরতে পারবেন।  সামুদ্রিক কাঁকড়া, চিংড়ি ডাঙ্গা ১০ মিটারের (৩৩ফুট) মধ্যেই থাকে।  রাতে আলো দেখলে চিংড়ি, কাঁকড়া, ঝিনুক কাছে চলে আসে।  তখন সহজেই তাদের ধরা যায়।  এগুলো অবশ্যই রান্না করে খাবেন।  নইলে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়বেন।

মলাস্ক বা অক্টোপাস, স্কুইড জাতীয় প্রানী খেতে পারবেন। শামুক, চিটন, সী কিউকাম্বার, ক্ল্যাম, পেরিউইংকেল, লিম্পেট ইত্যাদি খাওয়া যায়।  সামুদ্রিক শৈবাল-স্পিরুলিনা খাওয়া অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর।

সাবধানতা:    গ্রীষ্মে ট্রপিক্যাল জোনে যদি লালচে সামুদ্রিক ঢেউ দেখেন তখন এই জাতীয় প্রানী বিষাক্ত  হতে পারে।  খবরদার তখন কোন মাছ বা এই জাতীয় প্রানী খাবেন না।  পটকা মাছ কখনও খাবেন না।   এটা বিষাক্ত।  যেসব শামুক জাতীয় প্রানী পানিতে থাকেনা সেগুলো খাওয়া যাবে না।

 

উভচর:

বিষাক্ত ব্যাঙ
বিষাক্ত ব্যাঙ

বিষাক্ত ব্যাঙসমূহ

ব্যাঙ সহজলভ্য উভচর এবং খাওয়া যায়। যেসব ব্যাঙ পানিতে থাকে, ত্বক মসৃন ও ভেজা ভেজা সেগুলো খাওয়া যায়।  তবে কিছু কিছু ব্যাঙ বিষাক্ত।  উজ্জ্বল রঙ, গায়ে x চিহ্ন থাকে এবং যেসব ব্যাঙ গাছে থাকে সেগুলো থেকে দুরে থাকুন। ঘরের কোনায় যে ব্যাঙ থাকে, যাকে কুনো ব্যাঙ বলি- সেটা খাওয়া যায়না। চামড়া অমসৃন, খসখসে ও শুকনো-ওগুলো খাওয়া যাবে না। এগুলো বিষাক্ত হতে পারে। এমন কি আপনার গায়ে বিষ ছুঁড়ে মারতেও মারে। দুরে থাকুন।  বিভিন্ন রঙে রঞ্জিত টিকটিকি ইংরেজীতে যাদের স্যালম্যান্ডর বলে সেগুলো খাওয়া যায় না। (ভাবতেই বমি আসে!)

সরীসৃপ:

বিষাক্ত টিকটিকি বাহিনী

বিষাক্ত tiktiki
বিষাক্ত-tiktiki

সরীসৃপও ভাল প্রোটিনের উৎস। তবে ভালমত রান্না করে খেতে হবে। বিশেষ করে সাপ, কচ্ছপ, ইগুয়ানা, মনিটর লিজার্ড এর গায়ে প্রচুর সালমোনেলা জীবাণু বাস করে। কাঁচা খাওয়া কখনও ঠিক নয় এবং রান্না চাপানোর পর হাত খুব ভালমত ধুয়ে নিতে হবে। পাঁচ আঙ্গুল বিশিষ্ট গুঁইসাপ, টিকটিকিও খাওয়া যায়।  শুধুমাত্র গিলা মনস্টার ও মেক্সিকান লিজার্ড খাওয়া যায়না।  মনিটর লিজার্ড এগুলোর লেজে মূল মাংস থাকে।  শরীর বাদ শুধু লেজ রান্না করতে পারেন।  খাওয়ার আগে হাত ভালমত ধুয়ে নিবেন।

 

বিষাক্ত কচ্ছপ

কচ্ছপও মাংসের ভাল উৎস। বেশির ভাগ মাংস পাওয়া যায় এর কাঁধের অংশ থেকে।  তবে বক্স কচ্ছপ খাওয়া যায়না কারন এটি বিষাক্ত মাশরুম খায় যার ফলে এর মাংসে বিষ ছড়িয়ে পড়ে।  তাছাড়া হক্সবিল কচ্ছপও খাওয়া যায়না।  আটলান্টিক মহাসাগরে এ কচ্ছপ পাওয়া যায়।  এর একটি বিষাক্ত থলি থাকে।  বিষাক্ত সাপ, কুমির এবং সামুদ্রিক বিশাল কচ্ছপ থেকে যথাসম্ভব দুরে থাকুন।

 

পাখি:

বিষাক্ত পাখি: পিটোইউই (Pitohui)

সবধরনের পাখি খাওয়া যায়; যদিও সবগুলোর স্বাদ সমান নয়।  নিউ গিনিতে একটি বিষাক্ত পাখি আছে অবশ্য- নাম পিটোইউই ।  মাছখেকো পাখিগুলোর চামড়া ছাড়িয়ে রান্না করা উচিত।  নইলে আঁশটে গন্ধ পাওয়া যায়।  কবুতর, ঘুঘুর স্বাদ ভাল।  রাতে বাসা থেকে ধরা সহজ।  যদিও সাপের কামড় খাওয়ার একটা রিস্ক থাকে।  লক্ষ্য রাখতে হবে তাদের বাসায় কখন আসে যায়।  তাদের বাসায় ডিমও পাওয়া যায়।  সেগুলোও স্বচ্ছন্দ্যে খেতে পারেন।  দুই একটি ডিম রেখে দেবেন তাহলে পাখিটি আবার ডিম পাড়বে।  আর আপনিও নিয়মিত খেতে পারবেন।

 

এখানে  যেসব ছোট প্রানী খেতে পারেন সেগুলো আলোচনা করা হল।  আমাদের দেশের মত অনেক দেশেই বন্যপ্রাণী নিধন নিষিদ্ধ। (এ সম্পর্কে  জানতে পড়ুন এখানে।) তবে প্রাণ বাঁচানোর ক্ষেত্রে আপনি যেকোন প্রানীই মেরে খেতে পারেন।  কোন দেশের আইনই এখনও অত কঠিন নয় যে মানুষের থেকে বন্য প্রাণীর গুরুত্ব বেশি দেবে। সাপ, ব্যাঙ, টিকটিকি ও খাওয়া যায়। তবে আমি হয়তো নিজেও খেতে পারবো না।  আপনাকে শুধু জানানো হলো।  চয়েস আপনার।  (এগুলো ইসলাম ধর্মে হারাম।  তবে জান বাঁচানো যেখানে ফরজ সেখানে খাওয়ার ব্যাপারে বিধি নিষেধের  শিথিলতা আছে।) তাছাড়া অন্যান্য ছোট প্রানী দিয়ে আপনি বড় প্রানী শিকার করতে পারেন।

 

আশ্রয়

পানি ও খাবারের পর আপনার যা প্রয়োজন তা হচ্ছে আশ্রয়। আশ্রয় এমন হওয়া উচিত যা আপনাকে রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, তুষার, পোকামাকড়, জীবজন্তু, ঠান্ডা ও গরম থেকে রক্ষা করবে।  একটি ভাল আশ্রয় আপনার বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তি বাড়িয়ে দেবে।  যেমন ধরুন প্রচন্ড ঠান্ডায় যদি বাইরে পড়ে থাকেন তাহলে আপনার শক্তি দ্রুত ক্ষয় হয়ে আপনি দুর্বল হয়ে পড়বেন। সেইসাথে বেঁচে থাকার আগ্রহও কমে যাবে।

 

স্থান নির্বাচন:

গ্রীষ্ম ও শীতের শেল্টারগুলো হয় আলাদা।  গ্রীষ্মে যেটা পারফেক্ট, শীতে সেটা নাও হতে পারে। আবহাওয়া ও ঋতুর উপর নির্ভর করে তৈরী করতে হবে আপনার আশ্রয়কেন্দ্র।  প্রাকৃতিক আশ্রয়গুলো (যেমন-পাহাড়ী গুহা) আপনার সময় ও শক্তি দুই বাঁচাবে। কিন্তু এখানে হিংস্র জন্তু, সাপ, কাঁকড়া বিছেরাও আশ্রয় নিতে পারে। সেক্ষেত্রে সেটা নিরাপদ নাও হতে পারে। আশ্রয় বা শেল্টার তৈরীর প্রথম ভুল হল খুব বড় করে তৈরী করতে যাওয়া। খুব বেশি বড় করতে গেলে সময় ও পরিশ্রম বেশি হয়।  তাছাড়া খুব ঠান্ডায় বড় ঘরে আপনাকে ঠান্ডা লাগবে বেশি।

 

শেল্টার তৈরীতে এই ব্যাপারগুলো নজর দিন:

  • আশ্রয়স্থল বানাতে আপনার কাছে কি কি যন্ত্রপাতি আছে? আপনি যা বানাতে চাচ্ছেন সেগুলো দিয়ে কি সেটা বানানো সম্ভব?
  • আপনার আশ্রয়ে যেন আপনি শুয়ে আরাম করতে পারেন এমন হওয়া উচিত। কন্টকশয্যা জাতীয় হলে হবেনা।
  •  শত্রূ এলাকা হলে আপনার আশ্রয় যেন তাদের চোখে না পড়ে এবং পালানোর যেন গোপন রাস্তা থাকে। প্রয়োজনে উদ্ধারকারীদের সিগন্যাল পাঠানো সহজ হয়।
  • আপনার আশ্রয় কেন্দ্র এমন হবে যা বন্য জন্তু থেকে আপনাকে রক্ষা করবে এবং যেখানে পাহাড়ের পাথর বা গাছ ভেঙ্গে পড়ার সম্ভবনা থাকে সেখান থেকে দুরে থাকতে হবে।
  • পোকামাকড়, সরীসৃপ ও বিষাক্ত গাছপালা থেকেও শেল্টার নিরাপদ দূরত্বে হতে হবে।
  • বৃষ্টিতে যেখানে হঠাৎ বন্যার পানি (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) চলে আসতে পারে সেটাও মাথা রাখুন।
  • জোয়ারের পানিতে যে এলাকা ডুবে যায় সেখান থেকে নিরাপদ দূরত্বে আপনার আশ্রয়কেন্দ্র বানাতে হবে।

আশ্রয়কেন্দ্র তৈরীতে BLISS শব্দটি মনে রাখুন। এখানে BLISS এর ব্যাখ্যা দিচ্ছি।

  • B–Blend in with the surroundings. (প্রকৃতির সাথে মিশে যান।)
  • L–Low silhouette. (দুর থেকে যেন আপনার ছায়া বোঝা না যায়।)
  • I–Irregular shape. (আপনার আকৃতি যেন সমান না হয়?)
  • S–Small. (ছোট আশ্রয়স্থল)
  • S–Secluded location. (নি:সঙ্গ স্থান)

এখন এখানে বেশ কিছু শেল্টার বানানোর নিয়ম কানুন আলোচনা করা যাক।

পনচো লিন টু

পনচো লিন টু খুব সহজেই কম সময়ে তৈরী করা সম্ভব। আপনার দরকার একটা প্যারাসুট বা ওয়াটার প্রুফ কাপড়, ৭ থেকে ১০ ফিটের একটা দড়ি এবং দুইটা গাছ বা খুঁটি।  ছবি দেখুন:

কিভাবে বানাবেন ভিডিও দেখতে পারেন:https://www.youtube.com/watch?v=QeN0L2gBNk8

পঞ্চোর উচ্চতা আপনার হাঁটু সমান হলে ভাল হয়-কোমর সমান নয়।  যদিও ভিডিওতে বেশ উঁচু দেখানো হয়েছে। শত্রু এলাকায় যত ছোট হয় তত ভাল। এর মেঝেতে কিছু ঘাস, পাতা বিছিয়ে নিন। এতে আপনার শরীর সহজে তাপ হারাবেনা এবং শুয়েও আরাম পাবেন।

পনচো তাঁবু

এর সুবিধা দু’পাশ থেকে প্রটেকশন পাওয়া যায়।  কিন্তু পনচো লিন টুর চেয়ে এতে শত্রুর গতিবিধি রাখা কঠিন হয়।

তিন পা বিশিষ্ট প্যারাসুট টিপি

সাথে যদি প্যারাসুট থাকে তাহলে একটা টিপি বানিয়ে ফেলুন।  খুব কম সময়ে একটি টিপি বানাতে পারবেন।  এটাতে বেশ কয়েকজন বাস করা যায়।  তাছাড়া সিগন্যাল ডিভাইস হিসাবেও এটি ভাল কাজ করে থাকে।  ছবিতে দেখানো কাজ গুলো করুন। আপনার তিন লাঠির দৈর্ঘ্য হবে ১৫ ফুট এবং প্রস্থ হবে ২ ইঞ্চি। সাথে আরও লাঠি যোগ করতে হবে। তবে মূল লাঠি হবে তিনটি। নিচের ভিডিওটি দেখুন:

 

 

মরুভূমি, সৈকত, তুন্দ্রা অঞ্চল  প্রত্যেক স্থানের আশ্রয় বানানোর ভিডিও লিংক দিলাম। এগুলো বর্ননার চেয়ে ভিডিও  বেশি কাজের।

তুন্দ্রা ও শীত:- https://www.youtube.com/watch?v=rwO9JeIu61Q

সাগর সৈকত:- https://www.youtube.com/watch?v=OLTK-CFNDeI

ভেজা ও পানিময় স্থান: https://www.youtube.com/watch?v=6faiIkL2de8

মরুভূমি: https://www.youtube.com/watch?v=V3TtSp4TF_0

অন্যান্য: https://www.youtube.com/watch?v=HG9BeyrOfZE

সাথে থাকুন। আগামীতে অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

 

(কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ইউ.এস আর্মি সারভাইভাল গাইড)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.